
১৯৬৫ সালে ৬ আগস্ট মালয়েশিয়া ফেডারেশন থেকে বের করে দেওয়া হয় সিঙ্গাপুরকে। এর তিন দিন পর এক বুক হাহাকার নিয়ে প্রেসিডেন্ট লি কুয়ান যখন সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখন তিনি দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কেঁদেই ফেলেছিলেন।
কারণ মাত্র ৭২৮ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর। ছিল না কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ, ছিল না পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা। উপরন্তু দেশের অধিকাংশ জনগণ ছিল অশিক্ষিত আর বেকার, যারা সাগরে মাছ মেরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এমন একটি দেশ নিয়ে কতদূর যেতে পারবেন তা ভেবেই কূল-কিনারা করতে পারছিলেন না লি কুয়ান।
এর আগে ব্রিটিশদের পরামর্শে মালয়েশিয়ায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন লি কুয়ান। ব্রিটিশরা লি’কে বুঝিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায় যোগ দিলে সিঙ্গাপুরে উন্নতির ছোঁয়া লাগবে। ব্রিটিশদের পরামর্শ শুনে দেশে গণভোটের আয়োজন করেন লি কুয়ান।
সেই সাথে মালয়েশিয়ার সাথে যোগ দেওয়ার পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালান। অবশেষে গণভোটে মালয়েশিয়ার সাথে যোগ দেওয়ার পক্ষে বিপুল সংখ্যক ভোট পড়ে।
১৯৬৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার অংশ হয়ে যায় সিঙ্গাপুর৷ তার আগে ব্রিটিশ ও জাপানের অধীনেও ছিল দেশটি।
কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে মালয়েশিয়া ফেডারেশনে যুক্ত হয়েছিল লি কুয়ান, তা অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে যায়। মালয়রা সিঙ্গাপুরকে নিজেদের অংশ হিসেবে মেনে নিতে পারেনি।
এখনকার মতো চাইনিজ, তামিল, ইন্দোনেশিয়ান আর মালয়দের নিয়েই ছিল সিঙ্গাপুর। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব ছিল। তার সাথে দারিদ্র্যতা আর দাঙ্গার কারণে সিঙ্গাপুরের অবস্থা তখন হ-য-ব-র-ল।
এরকম একটি দ্বীপরাষ্ট্র নিয়ে লি কুয়ান যখন মালয়েশিয়া ফেডারেশনে অতিরিক্ত দর-কষাকষি করছিলেন, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আবদুর রহমান সিঙ্গাপুরকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সিঙ্গাপুরের জনগণের অনিচ্ছা সত্ত্বেও পার্লামেন্টে সিদ্ধান্ত নিয়ে সিঙ্গাপুরকে পাকাপাকিভাবে বের করে দেওয়া হয়।
এই ঘটনায় লি কুয়ানের হৃদয় ভাঙলেও, আত্মবিশ্বাস ছিল অটুট। অত্যধিক বেকারত্ব আর আবাসন–সংকট মোকাবেলায় ১৯৭০ সালের শেষ দিকে একটি আধুনিকীকরণ কর্মসূচি শুরু করে সিঙ্গাপুর। কর্মসূচির মধ্যে ছিল উৎপাদনশিল্প প্রতিষ্ঠা, বসবাসযোগ্য বৃহত্তর হাউজিং এস্টেটের বিকাশ ও জনশিক্ষা।
এই কাজের জন্য লি কুয়ান বেছে নিয়েছিলেন তার দেশের কিছু মেধাবী মানুষ। তবে তাদের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সততাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই সব মানুষদের নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীর ঘুরে দাঁড়ায় সিঙ্গাপুর।
তৃতীয় বিশ্বের এক দরিদ্র রাষ্ট্র থেকে জায়গা করে নেয় প্রথম বিশ্বের আধুনিক রাষ্ট্রে। মালয়েশিয়া থেকে যখন বের করে দেওয়া হয় তখন সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় ছিল ৫০০ মার্কিন ডলার। বর্তমানে কয়েক শত গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ডলারের বেশি।
বর্তমান সিঙ্গাপুরকে একটা সাজানো বাগান কিংবা নাগরিক ভূস্বর্গ বলা যায়। নগরের রাস্তাঘাট ঝকঝকে পরিষ্কার, দক্ষ পরিবহনব্যবস্থা থাকায় রাস্তাঘাটে চোখে পড়ে না কোনো যানজট। এছাড়া সর্বাধুনিক আবাসিক ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক শপিংমল, বৈচিত্র্যময় পর্যটন ও বিনোদনের পর্যাপ্ত আয়োজন, সর্বাধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা তো রয়েছেই। এসবের বিবেচনায় সিঙ্গাপুরকে অনায়াসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবাসস্থল বলা যায়।
এক সময় অশিক্ষা আর আবাসন সংকটে ভুগেছে সিঙ্গাপুর। এখন দেশটিতে প্রায় সব নাগরিকের জন্য আধুনিক পরিকল্পিত আবাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে সিঙ্গাপুর।
বর্তমানে দেশটিতে সব শিশু ও কিশোর-কিশোরীকে স্কুলে পাঠানো মা-বাবার জন্য বাধ্যতামূলক। এই আইন না মানলে জেলে যেতে হয় মা-বাবাকে।
সিঙ্গাপুরের হাসপাতালগুলো যেমন বিশ্বসেরা, তেমনি তাদের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও পলিটেকনিকগুলোর মানও পশ্চিমাদের সাথে তুলনীয়।
ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত-গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ মালাক্কা প্রণালির তীরে অবস্থিত হওয়ায় বেশ কয়েকটি আধুনিক ও দক্ষ বন্দর গড়ে তুলেছে দেশটির সরকার। এই খাত এখন দেশটির আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও অনেক এগিয়ে গেছে সিঙ্গাপুর।
১৯৬৫ সালের অপমানের জবাব উন্নয়ন দিয়েই দিয়েছেন সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান। ৫৬ বছরের চেষ্টায় অধিকাংশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে মালয়েশিয়াকে পেছনে ফেলেছে সিঙ্গাপুর।
বলা হয়ে থাকে সিঙ্গাপুরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সম্ভাবনাময় ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু আজ জীবিকার তাগিদে সিঙ্গাপুরে ছুটতে হয় আমাদের যুবকদের। কেন?
লেখক: জাহিদ হাসান মিঠু

